মা ইলিশ রক্ষা অভিযান: কিছু খণ্ড স্মৃতি

Client Logo
  • গল্প লিখেছেনঃ  মোঃ রেজাউল করিম
  • তারিখঃ 2017-04-19
  • ভিজিটঃ 862
 
২০১৪ সালের কথা। সরকার পূর্বঘোষণা অনুসারে, সেপ্টেম্বর মাসের ০৫-১৪ তারিখ সারাদেশে 'মা ইলিশ রক্ষা অভিযান' কার্যক্রম শুরু হয়। ভোলাতে এর কিছুদিন আগে নিয়োগকৃত হয়েছি মাত্র। ০৫ সেপ্টেম্বর তারিখে কোরবানির ঈদ। অভিযান উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের অধিকাংশ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে এই সময়টাতে উপজেলাগুলোতে ন্যাস্ত করা হয়েছে, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তত্ত্বাবধানে থেকে অভিযান কার্যক্রমে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার জন্য। চাকুরি জীবনের প্রথম ঈদ তাই আর পরিবারের সদস্যদের সাথে করার সুযোগ রইলো না। কষ্ট পেয়েছি কিছুটা, কিন্তু কিছুই করার নেই। ০৪ তারিখ সন্ধ্যায় আমরা জেলা সদর থেকে উপজেলা সদরে রওয়ানা হই। সিনিয়র একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে আমার একত্রে দায়িত্ব পড়ল বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। মৎস্য অভিযানের সেই সময়ের কিছু খণ্ড স্মৃতিই এ রোমন্থনের উপজীব্য। বোরহানউদ্দিন উপজেলার দুই পাশ দিয়ে দু'টি নদী- মেঘনা ও তেতুলিয়া। এই সময়টাতে প্রজননের নিমিত্ত সমুদ্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ ডিম পাড়তে নদীতে আসে। মেঘনা হলো একটি প্রধান চ্যানেল এবং ইলিশ প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ অভয়াশ্রম। শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে সমুদ্র থেকে বাংলাদেশে রুপালি ইলিশ প্রবেশ করে এই নদী পথেই। ০৪ তারিখ দিবাগত রাতে তথা ০৫ তারিখ প্রথম প্রহরেই উপজেলা মৎস্য অফিসার, পুলিশ ফোর্স এবং উপজেলা প্রশাসন থেকে আগত সহকারীগণসহ আমরা পৌঁছালাম মেঘনা নদীর পাড়ে, যতটুকু মনে পড়ে মীর্জা কালুর ঘাটে। সেখান থেকে উপজেলা মৎস্য অফিসার অভিযান সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ থেকে কিছু শুকনা খাবার, ট্রলারের (পূর্বে রিকুইজিশন করা সামুদ্রিক ফিশিং বোট) জন্য প্রর্যাপ্ত ফুয়েল নিয়ে নিলেন। চারপাশে সাদা জ্যোৎস্নায় মেঘনার মাঝখানে আমরা ট্রলারে করে একদিক থেকে আরেকদিকে ছুটে চলেছি। চার পাশে নৌকার কিছু দূরে দূরে অনেক নৌকা দেখা যায়। কিছু নৌকাকে পিছন থেকে ধাওয়া করি। কয়েকজন জেলেকে আটক করা হয় এবং সরকার ঘোষিত নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে মাছ ধরার কারণে 'মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০'- এর অধীনে আটককৃত ও দোষী হিসেবে প্রমানিত জেলেদেরকে সাজার আওতায় আনা হয়। এরপর ফিরে আসি গভীর রাতে সেদিনের মত অভিযান শেষ করে। পরদিন সকালেই ঈদের আমেজে মানুষ মেতে উঠবে, কিন্তু আমাদের সে সুযোগ তখন খুব বেশি নেই। তখন সে উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিয়োগকৃত নেই। থানার ওসি সাহেবের নিমন্ত্রণে আমরা দুপুরে সেখানে ঈদ আনন্দ উপভোগ করি। প্রতিদিন অভিযান হয়। অভিযুক্ত জেলেদেরকে আটক করা হয়, জেলেদের নৌকার অবৈধ জাল, মাছ সব জব্দ করা হয়। একদিক দিয়ে জেলেদেরকে ধাওয়া করলে, অনেকদূর পর দেখা যায় পেছন দিকে কিছু নৌকা আবার বের হয়েছে। তখন আবার পেছন দিকে ফিরে ধাওয়া করতে করতে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলে। এদের মাছ ধরার নৌকাগুলোর অধিকাংশই ইঞ্জিন চালিত ছোট ডিঙি নৌকা, অনেকগুলোই আবার ইঞ্জিন ছাড়া। আমাদের রিকুইজিশন দেওয়া নৌকাগুলো নিরাপত্তার জন্য এবং ভ্রাম্যমান আদালতের বহর, আটককৃত জেলে ও জব্দকৃত মালামাল বহনের জন্য সাধারণত একটু বড় আকারের হয়ে থাকে, যদিও গতি ওদের থেকে কিছুটা বেশি হয়। এর ফলে অনেক সময় খুব কাছা-কাছি গিয়েও কিছু নৌকা ধরার সময় জেলেদের নৌকা দ্রুত ঘুরিয়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে অভিযানকে অধিকতর কার্যকর ও গতিশীল করতে হলে সরকারি উদ্যোগে ভ্রাম্যমান আদালতের বহরের নৌকার সাথে অন্তত একটি স্পিডবোট বা এর সংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত খরচ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে ভাল হয়। যদিও আমাদের ১০ দিনের এই কর্মসূচীতে একটি ভাড়া করা স্পীডবোট দু'দিন আমরা ব্যবহার করার সুযোগ পাই সেবার, তবুও এটা পর্যাপ্ত বলে মনে হয়না। কখনও কখনও আমরা জেলে নৌকার পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে নদীর পড়ের অংশে খালের ভেতর ঢুকে যাই, যা একটু ঝুঁকিপূর্ণ একারণে যে, খালের দুই ধারে এবং রাস্তায় এলাকার মানুষ এবং অন্যান্য জেলেরা জড়ো হয়ে পাল্টা আক্রমন করতে পারে। এমন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটার কথা শুনেও থাকি আমরা। তাই এরপর থেকে একটু সতর্ক হয়ে আমারা সামনের খালের ভেতর যাই, যাতে আমাদের নৌকা বা কারও উপর অতর্কিত কোন আঘাত বা আক্রমণ না হয়। এর পরেও এ ধরণের বিষয়গুলোতে ঝুঁকি একটু থেকেই যায়। এর মাঝেই ঝুঁকি নিয়ে আমাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে হয় দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। এসময় আরও একটি প্রধান কাজ হল- নদীতে ইলিশ ধরার জন্য জেলেরা যে জাল পেতে রাখে, আমরা সেগুলো জব্দ করে ট্রলারে তুলি। এভাবে সেই দশ দিনের প্রায় প্রতিদিনই কখনও ২০, ৩০, ৪০, ৫০ কিলোমিটার বা তারও বেশি পরিমান জাল জব্দ করি, যার অধিকাংশই আবার কারেন্ট জাল। সেবারই আমার প্রথম জ্যান্ত ইলিশ দেখার বিরল সৌভাগ্য হয়। আমাদের অভিযানের বেশ কয়েকদিনই দুপুরে নদীর উপরে শুধু শুকনো খাবার খেয়েই আমাদের দিন কেটে যায়। দুপুরে খাওয়ার জন্য ঘাটে আসা মানে তখন আবার জেলেরা নেমে যাবে এবং জাল ফেলে বা তুলে নিয়ে যাবে। অনেক সময় বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে, কখনওবা মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যেই আমাদের অভিযান চলতে থাকে তার আপন গতিতে। দিনে দুই-তিন বারও অনেক সময় বৃষ্টি হয়। এভাবে পাড়ে ভিড়তে ভিড়তে সন্ধ্যা পার হয়ে যায় অনেকদিন। জোয়ারের সময় জেলেরা জাল ফেলে যাওয়ার চেষ্টা করে আর ভাটার সময় তা তুলে নিয়ে যায়। আমরা এমন সময়ে পাড়ে ভিড়ার চেষ্টা করি, যখন জাল ফেলার সময়টা চলে যায় এবং আমরা থাকা অবস্থায় যাতে নদীতে জাল ফেলতে না পারে। সন্ধার পরে পাড়ে ভীড়ে জব্দকৃত অবৈধ জাল ফাঁকা কোন জায়গায় নামিয়ে ধ্বংস করা হয় প্রতিদিন। এরপর শুরু হয় জব্দকৃত মাছ মসজিদ, মাদ্রাসা, ইয়াতিমখানা, অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্র মানুষদের মাঝে বিতরণ করার পালা। সবকিছু শেষ করে ডাক বাংলোতে আমাদের রুমে আসতে আসতে তখন প্রায়দিনই রাত ৮.০০-৯.০০ টার মত বেজে যায়। কোনমতে গোসল করে বা হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার কোন কোন দিন রাত প্রায় ১১.০০ টার দিকে দ্বিতীয় ধাপের অভিযানের জন্য বের হয়ে যেতে হয় মেঘনা বা তেঁতুলিয়া নদীতে। সেখানে নদীতে একই ধরণের অভিযান পরিচালনা করে দোষী প্রমানিত জেলেদেরকে সাজার আওতায় আনা, জব্দকৃত অবৈধ জাল ধ্বংস, জব্দকৃত মাছ বিলিবন্টন করে ডাক বাংলোতে ফিরে আসতে আসতে কখনও রাত ৩-৪ টা বেজে যায়। আমার মনে আছে, একদিন রাতে অভিযান থেকে ফেরার সময় এক মাদ্রাসায় (যার ছাত্র সংখ্যা ২০০ এর অধিক) ভোর প্রায় ৪ টার দিকে প্রায় দেড় মনের অধিক ইলিশ মাছ ছাত্রদের খাওয়ার জন্য বিতরণ করে পরে ডাকবাংলোতে নিজের রুমে ফিরি। এভাবে পালা করে একেকজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একেক নদীতে মা ইলিশ রক্ষার জন্য ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হয়েছে। একদিন কোন একটা সোর্স থেকে উড়ো খবর পাই যে, গভীর রাতে একটি ঘাটে ইলিশ মাছ কেনা-বেচা হয়। সেদিনই প্ল্যান মাফিক দিবাগত রাত প্রায় ৩.৩০ টার দিকে পুলিশ ফোর্স আমাদের আমাদের ডাক বাংলোতে এসে হাজির হয় এবং আমরা সেই ঘাটের দিকে রওয়ানা দিই। সেখানে ভোর পর্যন্ত থাকার পরেও তেমন কোন চালান আমরা আমাদের গোচরীভূত হয়নি। আমাদের দৈনিক গড়ে প্রায় ১৫-১৮ ঘন্টা পরিশ্রম হয়, অভিযান ও এর সংশ্লিষ্ট কাজে। রোদ-বৃষ্টি, ঘামে ভিজে এভাবে দায়িত্ব পালন করতে করতে আমার পায়ের আঙুলে ফাঙ্গাসের আক্রমণও হয়। এভাবেই দেখতে দেখতে একসময় দশ দিনের অভিযান শেষ হয়। ১০ দিনের অভিযানের সফল সমাপ্তি শেষে পরদিন সকালে আমরা বোরহানউদ্দিন উপজেলা থেকে ভোলা সদরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে দুপুর নাগাদ সেখানে পৌঁছাই। পেছনে রয়ে যায় আমার আর আমাদের টিমের ১০ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের স্মৃতি আর দেশের স্বার্থের জন্য কাজ করতে পারার এক সীমাহীন তৃপ্তি। দৈনিক 'আমদের সময়' পত্রিকার এক প্রতিবেদন মতে, "মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে তিন লাখ ৮৫ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চার লাখ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হয়। আর চলতি বছরে সে উৎপাদন সাড়ে চার লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে। আর প্রতিবছর এই ক্রমবর্ধন হার আট থেকে ১০ শতাংশ।" এভাবেই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ ছাড়াও যেকোন দুর্যোগ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও ম্যাজিস্ট্রেটরা ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে প্রজনন মৌসুমে সমুদ্র থেকে নদীতে ডিম পাড়তে আসা এই মা ইলিশকে রক্ষা করতে মৎস্য অভিযান পরিচালনা করে। শত শত ম্যাজিস্ট্রেট ও তাদের মোবাইল কোর্ট টিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টার এই ফসল দেশবাসী ভোগ করে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, দেশের কল্যাণে ভবিষ্যতেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ এভাবে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করবে- এটাই হোক আজিকার প্রত্যয়। তথ্যসূত্রঃ ১। http://www.dainikamadershomoy.com/todays-paper/last-page/69439/ইলিশের-সুদিন-ফেরাতে-মহাযজ্ঞ ২। http://www.fisheries.gov.bd লেখকঃ মোঃ রেজাউল করিম (১৭৪৯২) সহকারী কমিশনার (৩৩ তম বিসিএস), জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বরিশাল এবং প্রশিক্ষণার্থী, রোল ২৬, ১০০ তম আইন ও প্রশাসন কোর্স, বিসিএস এডমিন একাডেমি, শাহবাগ, ঢাকা।

 প্রিন্ট